শবে বরাত | সঠিক দৃষ্টিকোণ পর্ব-২

                                                                   بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

                                     শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

শবে বরাত | সঠিক দৃষ্টিকোণ পর্ব-১

শবে বরাত | সঠিক দৃষ্টিকোণ পর্ব-২ (শেষ পর্ব)

শবে বরাত নামটি হাদিসের কোথাও উল্লেখ হয়নি 

প্রশ্ন থেকে যায় হাদিসে কি সত্যি লাইলাতুল বরাত বা শবে বরাত নেই? সত্যি হাদিসের কোথাও আপনি শবে বরাত বা লাইলাতুল বারায়াত নামের কোন রাতের নাম খুঁজে পাবেন না। যে সকল হাদিসে এ রাতের কথা বলা হয়েছে তার ভাষা হল ‘লাইলাতুন নিসফ মিন শাবান’ অর্থাৎ মধ্য শাবানের রাত্রি। শবে বরাত বা লাইলাতুল বারায়াত শব্দ আল-কুর’আনে নেই, হাদিসে রাসুলেও নেই। এটা মানুষের বানানো একটা শব্দ। ভাবলে অবাক লাগে যে, একটি প্রথা ইসলামের নামে শত শত বছর ধরে পালন করা হচ্ছে অথচ এর আলোচনা আল-কুর’আনে নেই। সহিহ হাদিসেও নাই। অথচ আপনি দেখতে পাবেন যে, সামান্য নফল আমলের ব্যাপারেও হাদিসের কিতাবে এক একটি অধ্যায় বা শিরোনাম লিখা হয়েছে।

শবে বরাত সম্পর্কিত প্রচলিত আকিদাহ বিশ্বাস ও আমল

শবে বরাত যারা পালন করেন তারা সবে বরাত সম্পর্কে যে সকল ধারণা পোষণ করেন ও উহাকে উপলক্ষ করে যে সকল কাজ করে থাকেন তার কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হল।

তারা বিশ্বাস করে যে, শবে বরাতে আল্লাহ তা’আলা সকল প্রাণীর এক বছরের খাওয়া দাওয়া বরাদ্দ করে থাকেন। এই বছর যারা মারা যাবে ও যারা জন্ম নিবে তাদের তালিকা তৈরি করা হয়। এ রাতে বান্দার পাপ ক্ষমা করা হয়। এ রাতে ইবাদত-বন্দেগী করলে সৌভাগ্য অর্জিত হয়। এ রাতে কুর’আন মাজিদ লাওহে মাহফুজ হতে ১ম আকাশে নাজিল করা হয়েছে। এ রাতে গোসল করাকে সওয়াবের কাজ মনে করা হয়। মৃত্যু ব্যক্তিদের রূহ এ রাতে দুনিয়ায় তাদের সাবেক গৃহে আসে। এ রাতে হালুয়া রুটি তৈরি করে নিজেরা খায় ও অন্যকে দেওয়া হয়। বাড়িতে মিলাদ পড়া হয়। আতশবাজি করা হয়। সরকারি-বেসরকারি ভবনে আলোক সজ্জা করা হয়। সরকারি ছুটি পালিত হয়। পরের দিন সিয়াম (রোজা) পালন করা হয়। কবরস্থানগুলো আগরবাতি ও মোমবাতি দিয়ে সজ্জিত করা হয়। লোকজন দলে দলে কবরস্থানে যায়। মাগরিবের পর থেকে মসজিদগুলো লোকে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। যারা পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ও জুমু’আয় মসজিদে আসে না তারাও এ রাতে মসজিদে আসে। মসজিদগুলিতে মাইক চালু করে ওয়াজ নসিহত করা হয়। শেষ রাতে সমবেত হয়ে দু’আ-মুনাজাত করা হয়। বহু লোক এ রাতে ঘুমানোকে অন্যায় মনে করে থাকে। নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ১০০ রাকাত, হাজার রাকাত ইত্যাদি সালাত আদায় করা হয়। লোকজন ইমাম সাহবকে জিজ্ঞেস করে,

‘হুজুর! শবে বরাতের সালাতে নিয়ম ও নিয়ত বলে দিন।’

কিভাবে সালাত আদায় করতে হবে, কোন রাকা’আত কোন সূরা তিলাওয়াত করবে তাও বলে দিতে কার্পণ্য করেন না। যদি এ রাতে ইমাম সাহেব বা মুয়াজ্জিন সাহেব মসজিদে অনুপস্থিত থাকেন তাহলে তাদের চাকুরি যাওয়ার উপক্রম হয়।

শবে বরাতের সম্পর্ক শুধু আমলের সাথে নয়

শবে বরাত সম্পর্কে উপরল্লেখিত কাজ ও আকিদাহসমুহ শবে বরাত উদযাপনকারীরা সকলকেই করেন তা কিন্তু নয়। কেউ আছেন উপরের সকল কাজের সাথে একমত পোষণ করেন। আবার কেউ আতশবাজি, আলোকসজ্জা পছন্দ করেন না, কিন্তু কবরস্থানে যাওয়া, হালুয়া-রুটি, ইবাদাত-বন্দেগী করে থাকেন। আবার অনেক আছেন যারা এ রাতে শুধু সালাত আদায় করেন ও পরের দিন সিয়াম (রোজা) পালন করেন। এ ছাড়া অন্য কোন আমল করেন না। আবার অঞ্চলভেদে আমলের পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু একটা বিষয় হল, শবে বরাত সম্পর্কে যে সকল ধর্ম বিশ্বাস বা আকিদাহ পোষণ করা হয় তা কিন্তু কোন দুর্বল হাদিস দ্বারাও প্রমাণিত হয় না। যেমন ভাগ্যলিপি ও বাজেট প্রনয়নের বিষয়টি। যারা বলেনঃ ‘আমলের ফাজিলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদিস গ্রহন করা যায়, অতএব এর উপর ভিত্তি করে শবে বরাত আমল করা যায়, তাদের কাছে আমার প্রশ্নঃ তাহলে শবে বরাতের আকিদাহ সম্পর্কে কি দুর্বল হাদিসেরও দরকার নেই? অথবা এ সকল প্রচলিত আকিদাহের ক্ষেত্রে যদি কোন দুর্বল হাদিস পাওয়াও যায় তাহলে তা দিয়ে কি আকিদাহগত কোন মাসয়ালা প্রমান করা যায়? আপনারা শবে বরাতের আমলের পক্ষ সমর্থন করলেন কিন্তু আকিদাহর ব্যাপারে কি জবাব দিবেন? কাজেই, শবে বরাত শুধু আমলের বিষয় নয়, আকিদাহরও বিষয়। তাই ে ব্যাপারে ইসলামের দা’য়ীদের সতর্ক হওয়ার দাওয়াত দিচ্ছি।

শবে বরাত সম্পর্কে এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, আল্লাহ তা’আলা এ রাতে আল-কুর’আন অবতীর্ণ করেছেন, তিনি এ রাতে মানুষের হায়াত, রিজিক ও ভাগ্যের ফায়সালা করে থাকেন, এ রাতে ইবাদাত- বন্দেগিতে লিপ্ত হলে আল্লাহ হায়াত ও রিজিক বাড়িয়ে সৌভাগ্যশালী করেন ইত্যাদি আকিদা কি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি মিথ্যা আরোপ করার মত অন্যায় নয়? আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা বলেনঃ

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَىٰ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُوَ يُدْعَىٰ إِلَى الْإِسْلَامِ ۚ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ [٦١:٧]

যে ব্যক্তি ইসলামের দিকে আহুত হয়েও আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা বলে; তার চাইতে অধিক যালেম আর কে? আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না। (সূরা সাফ, ৭)

শাবানের মধ্যরজনীর ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসসমূহের পর্যালোচনা 

১ নং হাদিস 

ইমাম তিরমিজি (রহঃ) বলেনঃ আমাদের কাছে আহমাদ ইবনে মুনি’ হাদিস বর্ণনা করেছেন যে তিনি ইয়াজিদ ইবনে হারুন থেকে, তিনি হাজ্জাজ ইবনে আরতাহ থেকে, তিনি ইয়াহিয়া ইবনে আবি কাসির থেকে, তিনি উরওয়াহ থেকে, তিনি উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেনঃ আমি এক রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লামকে বিছানায় পেলাম না তাই আমি তাকে খুঁজতে বের হলাম, ‘বাকী’ নামক কবরস্থানে তাকে পেলাম। তিনি (সাঃ) বললেন, তুমি কি আশংকা করেছো যে আল্লাহ ও তার রাসুল তোমার সাথে অন্যায় আচরণ করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি মনে করেছি আপনি আপনার অন্য কোন স্ত্রীর কাছে গিয়েছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মধ্য শাবানের রাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরন করেন, অতঃপর কালব গোত্রের পালিত বকরীর পশমের পরিমানের চেয়েও অধিক পরিমান লোকদের ক্ষমা করেন।

ইমাম তিরমিজি বলেনঃ আয়িশা (রাঃ) এর এই হাদিস আমি হাজ্জাজের বর্ণিত সনদ (সূত্র) ছাড়া অন্য কোনভাবে চিনি না। আমি মুহাম্মাদকে (ইমাম বুখারি) বলতে শুনেছি যে, তিনি হাদিসটিকে দুর্বল বলতেন। তিরমিজি (রহঃ) বলেন, ইয়াহহিয়া ইবনে কাসির উরওয়াহ থেকে হাদিস শুনেন নি। এবং মুহাম্মদ (ইমাম বুখারি) বলেছেনঃ হাজ্জাজ ইয়াহহিয়া ইবনে কাসির থেকে শুনেন নি।

এ হাদিসটি সম্পর্কে ইমাম বুখারি ও ইমাম তিরমিজির মন্তব্যে প্রমাণিত হয় যে, হাদিস দুটো দিক দিয়ে মুনকাতি অর্থাৎ উহার সূত্র থেকে বিচ্ছিন্ন। অপর দিকে এ হাদিসের একজন বর্ণনাকারী হাজ্জাজ ইবনে আরতাহ মুহাদ্দিসীনদের নিকট দুর্বল বলে পরিচিত।

তাহলে ভায়েরা আমার! যারা শবে বরাতের বেশি বেশি ফজিলত বয়ান করতে অভ্যস্ত তারা তিরমিজি বর্ণিত এই হাদিসটি খুব গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেন অথচ যারা হাদিসটির অবস্থা সম্পর্কে ভাল জানেন তাদের এ মন্তব্যটুকু গ্রহন করতে চান না। এ হাদিসটা আমলের ক্ষেত্রে পরিত্যাজ্য হওয়ার জন্য ইমাম তিরমিজির এ মন্তব্যটুকু কি যথেষ্ট নয়? যদি তর্কের খাতিরে এ হাদিসটিকে বিশুদ্ধ বলে ধরে নেওয়া হয় তাহলে কি প্রমাণিত হয়? আমরা যারা ঢাকঢোল পিটিয়ে মসজিদে একত্র হয়ে শবে বরাত উদযাপন করি তাদের আমলের সাথে এ হাদিসটির মিল কোথায়?

বরং এ হাদিসে দেখা গেল রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বিছানা ছেড়ে চলে গেলেন, আর পাশে আয়িশা (রাঃ) কে ডাকলেন না। ডাকলেন না অন্য কাউকে তাকে জাগালেন না বা সালাত আদায় করতে বললেন না। অথচ আমরা দেখতে পাই যে, রমজানের শেষ দশকে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) নিজে রাত জেগে ইবাদত বন্দেগী করতেন এবং পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন। বেশি পরিমানে ইবাদাত-বন্দেগি করতে বলতেন। যদি ১৫ শাবানের রাতে কোন ইবাদাত করার ফজিলত থাকত তাহলে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কেন আয়িশাকে (রাঃ) বললেন না? কেন রমজানের শেষ দশকের মত সকলকে জাগিয়ে দিলেন না, তিনি তো নেক কাজের প্রতি মানুষকে আহবান করার ক্ষেত্রে আমাদের সকলের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি তো কোন অলসতা বা কৃপণতা করেননি।

 ২ নং হাদিস

আলা ইবনে হারিস থেকে বর্ণিত, আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ এক রাতে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। সিজদাহ এত দীর্ঘ করলেন যে, আমি ধারণা করলাম তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আমি এ অবস্থা দেখে তার ব্রদ্ধাঙ্গুল ধরে নারা দিলাম, আঙ্গুলটি নড়ে উঠল। আমি চলে এলাম। সালাত শেষ করে তিনি বললেন, হে আয়িশা অথবা বললেন হে হুমায়রা! তুমি কি মনে করেছ আল্লাহর নবী তোমার সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন? আমি বললাম, আল্লাহর কসম হে রাসুল! আমি এমন ধারণা করিনি। বরং আমি ধারণা করেছি আপনি না জানি ইন্তেকাল করলেন! অতঃপর তিনি বললেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ভাল জানেন। তিনি বললেন, এটা মধ্য শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ তা’ আলা তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোনিবেশ করেন। ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন। রহমত প্রার্থনাকারীদের রহম করেন। এবং হিংসুকদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেন। (বায়হাকি তাঁর শুয়াবুল ইমান কিতাবে বর্ণনা করেছেন)

হাদিসটি মুরসাল। সহিহ বা বিশুদ্ধ নয়। কেননা বর্ণনাকারী ‘আলা’ আয়িশা (রাঃ) থেকে শুনেন নি।

৩ নং হাদিস

আলী ইবনে আবী তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যখন শা‘বানের মধ্যরাত্রি আসবে তখন তোমরা সে রাতের কিয়াম তথা রাতভর নামায পড়বে, আর সে দিনের রোযা রাখবে; কেননা সে দিন সুর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন: ক্ষমা চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি ক্ষমা করব। রিযিক চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি রিযিক দেব। সমস্যাগ্রস্ত কেউ কি আছে যে আমার কাছে পরিত্রাণ কামনা করবে আর আমি তাকে উদ্ধার করব। এমন এমন কেউ কি আছে? এমন এমন কেউ কি আছে? ফজর পর্যন্ত তিনি এভাবে বলতে থাকেন”।

১মতঃ এ হাদিসটি দুর্বল। কেননা এ হাদিসের সনদে ইবনে আবি সাবুরাহ নামে এক ব্যক্তি আছেন, জিনি অধিকাংশ হাদিস বিশারদের নিকট হাদিস জালকারী হিসাবে পরিচিত। এ যুগের বিখ্যাত মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দিন আল-বানি (রহঃ) বলেছেন, হাদিসটি সনদের দিক দিয়ে একেবারেই দুর্বল।
২য়তঃ অপর একটি সহিহ হাদিসের বিরোধি হওয়ার কারনে এ হাদিসটি গ্রহণযোগ্য নয়। সে সহিহ হাদিসটি হাদিসে নুযূল নামে পরিচিত, যা ইমাম বুখারি ও মুসলিম তাদের কিতাবে বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি হলঃ

আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) বলেছেন, আমাদের রব আল্লাহ তা’আলা প্রতি রাতের এক তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন ও বলতে থাকেনঃ কে আছ আমার কাছে দু’আ করবে আমি কবুল করব। কে আছ আমার কাছে চাইবে আমি দান করব। কে আছ আমার কাছে ক্ষমা  প্রার্থনা করবে আমি ক্ষমা করব। (বুখারি ও মুসলিম)

আর উপরের ৩ নং হাদিসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা’আলা মধ্য শাবানের রাতে নিকটতম আকাশে আসেন ও বান্দাদের দু’আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন। কিন্তু বুখারি ও মুসলিম বর্ণিত এ সহিহ হাদিসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা’আলা প্রতি রাতের শেষের দিকে নিকটতম আকাশে অবতরন করে দু’আ কবুলের ঘোষণা দিতে থাকেন। আর এই হাদিসটা সর্বমোট ৩০ জন সাহাবি বর্ণনা করেছেন এবং বুখারি এবং মুসলিম ও সুনানের প্রায় সকল কিতাবে এসেছে। তাই হাদিসটা প্রসিদ্ধ। অতএব এই মশহুর হাদিসের বিরোধী হওয়ার কারনে ৩ নং হাদিসটা পরিত্যাজ্য হবে। কেউ বলতে পারেন যে এই দুই হাদিসের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। কারন ৩ এর বক্তব্য হল আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরন করেন মধ্য শাবানের রাতের শুরু থেকে। আর এই হাদিসের বক্তব্য হল প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। অতএব দু’ হাদিসের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। যে কারনে ৩ নং কে পরিত্যাগ করতে হবে। আমি বলব আসলেই এদের মধ্যে বিরোধ আছে। কেননা আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণিত বুখারি ও মুসলিম হাদিসের বক্তব্য হল আল্লাহ তা’আলা প্রতি রাতের শেষ অংশে দুনিয়ার আকাশে আসেন। আর প্রতি রাতের মধ্যে শাবান মাসের ১৫ তারিখ রাতও অন্তর্ভুক্ত। অতএব এ হাদিস মতে অন্যান্য রাতের মত শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তা’আল দুনিয়ার আকাশে আসেন। কিন্তু ৩ নং হাদিসের বক্তব্য হল শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাতের ১ম প্রহর থেকে আল্লাহ তা’আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন।

৪ নং হাদিস

উসমান ইবনে আবিল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেয়ঃ আছে কি কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। আছে কি কেউ কিছু চাইবার আমি তাকে তা দিয়ে দিব। রাসুল (সাঃ) বলেনঃ মুশরিক ও ব্যভিচারী বাদে সকল প্রার্থনাকারীর প্রার্থনা কবুল করা হয়। (বায়হাকি, শুয়াবুল ইমান)

বিখ্যাত মুহাদ্দিস নাসিরুদ্দিন আল্বানি (রহঃ) হাদিসটিকে তাঁর সংকলন ‘যয়িফ আল-জামে’ নামক কিতাবের ৬৫২ নং ক্রমিকে দুর্বল প্রমান করেছেন। শবে বরাত সম্পর্কে  এছাড়া বর্ণিত অন্যান্য সকল হাদিস সম্পর্কে ইবনে রজব হাম্বলি (রহঃ) বলেনঃ এ মর্মে বর্ণিত অন্য সকল হাদিসই দুর্বল।

শাবানের মধ্যরজনীর সম্পর্কিত হাদিসসমুহ পর্যালোচনার সারকথা

শবে বরাত সম্পর্কিত হাদিসগুলো উল্লেখ করা হল। আমি মনে করি এ সম্পর্কে যত হাদিস আছে তা এখানে এসেছে। বাকি যা আছে সেগুলোর অর্থ বিভিন্ন সুত্রে বর্ণিত, এ সকল হাদিসের দিকে লক্ষ্য করে আমরা কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবেই বুঝে নিতে পারি।

(১) এ সকল হাদিসের কোন একটি দ্বারাও প্রমাণিত হয়নি যে, ১৫ শাবানের রাতে আল্লাহ তা’আলা আগামি এক বছরে যারা ইন্তেকাল করবে, যারা জন্মগ্রহন করবে, কে কি খাবে সেই ব্যাপারে ফয়সালা করেন। যদি থাকেও তাহলে তা আল-কুর’আনের বক্তব্য বিরোধী হওয়ায় তা গ্রহন করা যাবে না। কারন আল-কুর’আনের স্পষ্ট কথা হল এ বিষয়গুলির ফয়সালা হয় লাইলাতুল কদরে।

(২) এ সকল হাদিসের কোথায় বলা হয়নি যে, এ রাতে মৃত ব্যক্তিদের আত্মা তাদের গৃহে আসে। বরং এটি একটি প্রচলিত বানোয়াট কথা। মৃত ব্যক্তির আত্মা কোন কোন সময় গৃহে আসাটা হিন্দুদের ধর্ম বিশ্বাস।

(৩) এ সকল হাদিসের কোথাও এ কথা নাই যে, আল্লাহ রাসুল (সাঃ) ও সাহাবীরা এ রাতে গোসল করেছেন, মসজিদে উপস্থিত হয়ে নফল সালাত আদায় করেছেন, জিকর-আযকার করেছেন, কুর’আন তিলওয়াত করেছেন, সারারাত জাগ্রত থেকেছেন, ওয়াজ নসিহত করেছেন কিংবা অন্যদের এ রাতে ইবাদত বন্দেগীতে উৎসাহিত করেছেন অথবা শেষ রাতে জামাতের সাথে দু’আ মুনাজাত করেছেন।

(৪) এ হাদিসসমুহের কোথাও এ কথা নাই যে, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এ রাতে হালুয়া-রুটি বা ভাল খানা তৈরি করে বিলিয়েছেন, বাড়িতে বাড়িতে যেয়ে মিলাদ পড়েছেন।

(৫) এসকল হাদিসের কোথায় নাই যে, আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বা সাহাবীরা এ রাতে দলে দলে কবরস্থানে গিয়ে কবর যিয়ারত করেছেন কিংবা কবরে মোমবাতি জ্বালিয়েছেন। এমনকি আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর যুগ বাদ দিলে খুলাফায়ে রাশেদীনের ত্রিশ বছরের ইতিহাসেও কি এর কোন একটা আমল পাওয়া যাবে? যদি না যায় তাহলে শবে বরাত সম্পর্কিত এ সকল আমল ও আকিদাহ কি বিদ’আত নয়? এ বিদ’আত সম্পর্কে উম্মতে মুহাম্মদীকে সতর্ক করার কারা পালন করবেন? এ দায়িত্ব পালন করতে হবে আলেম-উলামাদের, দ্বীন প্রচারক, মসজিদের ইমাম ও খতীবদের। যে সকল বিষয়ে কুর’আন ও সহিহ হাদিসের ইশারা নাই সে সকল আমল থেকে সাধারন মুসলিম সমাজকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন করতে হবে নবী-রাসুলগণের উত্তরসূরিদের।

এ রাত্রি উদযাপন ও এতদসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর

# শা’বানের মধ্যরাত্রি উদযাপন করা যাবে কিনা?

উত্তরঃ শা’বানের মধ্যরাত্রি পালন করার কি হুকুম এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে তিনটি মত রয়েছে:

  • এক. শা‘বানের মধ্য রাত্রিতে মাসজিদে জামাতের সাথে নামায ও অন্যান্য ইবাদত করা জায়েয । প্রসিদ্ধ তাবেয়ী খালেদ ইবনে মি‘দান, লুকমান ইবনে আমের সুন্দর পোশাক পরে, আতর খোশবু, শুরমা মেখে মাসজিদে গিয়ে মানুষদের নিয়ে এ রাত্রিতে নামায আদায় করতেন। এ মতটি ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়ীয়াহ থেকেও বর্ণিত হয়েছে। (লাতায়েফুল মা‘আরেফ পৃঃ১৪৪)। তারা তাদের মতের পক্ষে কোন দলীল পেশ করেননি। আল্লামা ইবনে রাজাব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) তাদের মতের পক্ষে দলীল হিসাবে বলেনঃ তাদের কাছে এ ব্যাপারে ইসরাইলি তথা পূর্ববর্তী উম্মাতদের থেকে বিভিন্ন বর্ণনা এসেছিল, সে অনুসারে তারা আমল করেছিলেন। তবে পূর্বে বর্ণিত বিভিন্ন দুর্বল হাদীস তাদের দলীল হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকবে।
  • দুই. শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত বন্দেগী করা জায়েয। ইমাম আওযা‘য়ী, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া, এবং আল্লামা ইবনে রজব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম) এ মত পোষণ করেন। তাদের মতের পক্ষে তারা যে সমস্ত হাদীস দ্বারা এ রাত্রির ফযীলত বর্ণিত হয়েছে সে সমস্ত সাধারণ হাদীসের উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করাকে জায়েয মনে করেন।
  • তিন: এ ধরণের ইবাদত সম্পূর্ণরূপে বিদ’আত — চাই তা ব্যক্তিগতভাবে হোক বা সামষ্টিকভাবে। ইমাম ‘আতা ইবনে আবি রাবাহ, ইবনে আবি মুলাইকা, মদীনার ফুকাহাগণ, ইমাম মালেকের ছাত্রগণ, ও অন্যান্য আরো অনেকেই এ মত পোষণ করেছেন। এমনকি ইমাম আওযায়ী যিনি শাম তথা সিরিয়াবাসীদের ইমাম বলে প্রসিদ্ধ তিনিও এ ধরনের ঘটা করে মাসজিদে ইবাদত পালন করাকে বিদ‘আত বলে ঘোষণা করেছেন।

তাদের মতের পক্ষে যুক্তি হলো :

  • ১.এ রাত্রির ফযীলত সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন দলীল নেই। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ রাত্রিতে কোন সুনির্দিষ্ট ইবাদত করেছেন বলে সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়নি। অনুরূপভাবে তার কোন সাহাবী থেকেও কিছু বর্ণিত হয়নি। তাবেয়ীনদের মধ্যে তিনজন ব্যতীত আর কারো থেকে বর্ণিত হয়নি। আল্লামা ইবনে রজব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেনঃ শা‘বানের রাত্রিতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অথবা তার সাহাবাদের থেকে কোন নামায পড়া প্রমাণিত হয়নি। যদিও শামদেশীয় সুনির্দিষ্ট কোন কোন তাবেয়ীন থেকে তা বর্ণিত হয়েছে। (লাতায়েফুল মা‘আরিফঃ১৪৫)। শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেনঃ ‘এ রাত্রির ফযীলত বর্ণনায় কিছু দুর্বল হাদীস এসেছে যার উপর ভিত্তি করা জায়েয নেই, আর এ রাত্রিতে নামায আদায়ে বর্ণিত যাবতীয় হাদীসই বানোয়াট, আলেমগণ এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন’।
  • ২. হাফেজ ইবনে রজব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) যিনি কোন কোন তাবেয়ীনদের থেকে এ রাত্রির ফযীলত রয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেনঃ ঐ সমস্ত তাবেয়ীনদের কাছে দলীল হলো যে তাদের কাছে এ ব্যাপারে ইসরাইলি কিছু বর্ণনা এসেছে। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, যারা এ রাত পালন করেছেন তাদের দলীল হলো, যে তাদের কাছে ইসরাইলি বর্ণনা এসেছে, আমাদের প্রশ্নঃ ইসরাইলি বর্ণনা এ উম্মাতের জন্য কিভাবে দলীল হতে পারে?
  • ৩. যে সমস্ত তাবেয়ীনগণ থেকে এ রাত উদযাপনের সংবাদ এসেছে তাদের সমসাময়িক প্রখ্যাত ফুকাহা ও মুহাদ্দিসীনগণ তাদের এ সব কর্মকান্ডের নিন্দা করেছেন। যারা তাদের নিন্দা করেছেন তাদের মধ্যে প্রখ্যাত হলেনঃ ইমাম আতা ইবনে আবি রাবাহ, যিনি তার যুগের সর্বশ্রেষ্ট মুফতি ছিলেন, আর যার সম্পর্কে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেছিলেনঃ তোমরা আমার কাছে প্রশ্নের জন্য একত্রিত হও, অথচ তোমাদের কাছে ইবনে আবি রাবাহ রয়েছে। সুতরাং যদি ঐ রাত্রি উদযাপনকারীদের পক্ষে কোন দলীল থাকত, তাহলে তারা ‘আতা ইবনে আবি রাবাহর বিপক্ষে তা অবশ্যই পেশ করে তাদের কর্মকাণ্ডের যথার্থতা প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন, অথচ এরকম করেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি।
  • ৪. পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, যে সমস্ত দুর্বল হাদীসে ঐ রাত্রির ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, তাতে শুধুমাত্র সে রাত্রিতে আল্লাহর অবতীর্ণ হওয়া এবং ক্ষমা করা প্রমাণিত হয়েছে, এর বাইরে কিছুই বর্ণিত হয়নি। মুলতঃ এ অবতীর্ণ হওয়া ও ক্ষমা চাওয়ার আহবান প্রতি রাতেই আল্লাহ তা’আলা করে থাকেন। যা সুনির্দিষ্ট কোন রাত বা রাতসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। এর বাইরে দুর্বল হাদীসেও অতিরিক্ত কোন ইবাদত করার নির্দেশ নেই।
  • ৫. আর যারা এ রাত্রিতে ব্যক্তিগতভাবে আমল করা জায়েয বলে মন্তব্য করেছেন তাদের মতের পক্ষে কোন দলীল নেই, কেননা এ রাত্রিতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বা তার সাহাবা কারো থেকেই ব্যক্তিগত কিংবা সামষ্টিক কোন ভাবেই কোন প্রকার ইবাদত করেছেন বলে বর্ণিত হয়নি। এর বিপরীতে শরীয়তের সাধারণ অনেক দলীল এ রাত্রিকে ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছে, তম্মধ্যে রয়েছেঃআল্লাহ বলেনঃ “আজকের দিনে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম”। (সূরা আল-মায়েদাহঃ ৩)। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ (যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন কিছুর উদ্ভব ঘটাবে যা এর মধ্যে নেই, তা তার উপর নিক্ষিপ্ত হবে)। (বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭)। তিনি আরো বলেছেনঃ (যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করবে যার উপর আমাদের দ্বীনের মধ্যে কোন নির্দেশ নেই তা অগ্রহণযোগ্য)। (মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৮)। শাইখ আব্দুল আজীজ ইবনে বায (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বলেনঃ আর ইমাম আওযা‘য়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) যে, এ রাতে ব্যক্তিগত ইবাদত করা ভাল মনে করেছেন, আর যা হাফেয ইবনে রাজাব পছন্দ করেছেন, তাদের এ মত অত্যন্ত আশ্চার্যজনক বরং দুর্বল; কেননা কোন কিছু যতক্ষন পর্যন্ত না শরীয়তের দলীলের মাধ্যমে জায়েয বলে সাব্যস্ত হবে ততক্ষন পর্যন্ত কোন মুসলিমের পক্ষেই দ্বীনের মধ্যে তার অনুপ্রবেশ ঘটাতে বৈধ হবে না। চাই তা ব্যক্তিগতভাবে করুক বা সামষ্টিক- দলবদ্ধভাবে। চাই গোপনে করুক বা প্রকাশ্য। কারণ বিদ‘আতকর্ম অস্বীকার করে এবং তা থেকে সাবধান করে যে সমস্ত প্রমাণাদি এসেছে সেগুলো সাধারণভাবে তার বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। (আত্‌তাহযীর মিনাল বিদ‘আঃ১৩)।
  • ৬. শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) আরো বলেনঃ সহীহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “তোমরা জুম‘আর রাত্রিকে অন্যান্য রাত থেকে ক্বিয়াম/ নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট করে নিও না, আর জুম‘আর দিনকেও অন্যান্য দিনের থেকে আলাদা করে রোযার জন্য সুনির্দিষ্ট করে নিও না, তবে যদি কারো রোযার দিনে সে দিন ঘটনাচক্রে এসে যায় সেটা ভিন্ন কথা”। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৪৪, ১৪৮)। যদি কোন রাতকে ইবাদতের জন্য সুনির্দিষ্ট করা জায়েয হতো তবে অবশ্যই জুম‘আর রাতকে ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে সুনির্দিষ্ট করা জায়েয হতো; কেননা জুম‘আর দিনের ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে এসেছে যে, “সুর্য যে দিনগুলোতে উদিত হয় তম্মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ট দিন, জুম‘আর দিন”। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫৮৪)। সুতরাং যেহেতু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুম‘আর দিনকে বিশেষভাবে ক্বিয়াম/নামাযের জন্য সুনির্দিষ্ট করা থেকে নিষেধ করেছেন সেহেতু অন্যান্য রাতগুলোতে অবশ্যই ইবাদতের জন্য সুনির্দিষ্ট করে নেয়া জায়েয হবে না। তবে যদি কোন রাত্রের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন দলীল এসে যায় তবে সেটা ভিন্ন কথা। আর যেহেতু লাইলাতুল ক্বাদর এবং রমযানের রাতের ক্বিয়াম/নামায পড়া জায়েয সেহেতু রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এ রাতগুলোর ব্যাপারে স্পষ্ট হাদীস এসেছে।

From Islam Q/A: # I read in a book that fasting on the middle of Sha’baan is a kind of bid’ah, but in another book I read that one of the days on which it is mustahabb to fast is the middle of Sha’baan… what is the definitive ruling on this?

Topic:  Laylat al-Nusf min Sha’baan (the middle of Sha’baan) should not be singled out for worship

Answer:

Praise be to Allaah.

There is no saheeh marfoo’ report that speaks of the virtue of the middle of Sha’baan that may be followed, not even  in the chapters on al-Fadaa’il (chapters on virtues in books of hadeeth etc.). Some maqtoo’ reports (reports whose isnaads do not go back further than the Taabi’een) have been narrated from some of the Taabi’een, and there are some ahaadeeth, the best of which are mawdoo’ (fabricated) or da’eef jiddan (very weak). These reports became very well known in some countries which were overwhelmed by ignorance; these reports suggest that people’s lifespans are written on that day or that it is decided on that day who is to die in the coming year. On this basis, it is not prescribed to spend this night in prayer or to fast on this day, or to single it out for certain acts of worship. One should not be deceived by the large numbers of ignorant people who do these things. And Allaah knows best.

Shaykh Ibn Jibreen.

 If a person wants to pray qiyaam on this night as he does on other nights – without doing anything extra or singling this night out for anything – then that is OK. The same applies if he fasts the day of the fifteenth of Sha’baan because it happens to be one of the ayyaam al-beed, along with the fourteenth and thirteenth of the month, or because it happens to be a Monday or Thursday. If the fifteenth (of Sha’baan) coincides with a Monday or Thursday, there is nothing wrong with that (fasting on that day), so long as he is not seeking extra reward that has not been proven (in the saheeh texts). And Allaah knows best.

Sheikh Muhammed Salih Al-Munajjid

শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে হাজারী নামায পড়ার কী হুকুম?

উত্তরঃ শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে একশত রাকাত নামাযের প্রতি রাকাতে দশবার সূরা কুল হুওয়াল্লাহ (সূরা ইখলাস) দিয়ে নামাজ পড়ার যে নিয়ম প্রচলিত হয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে বিদ‘আত।

এ নামাযের প্রথম প্রচলন

এ নামাযের প্রথম প্রচলন হয় হিজরী ৪৪৮ সনে। ফিলিস্তিনের নাবলুস শহরের ইবনে আবিল হামরা নামীয় একলোক বায়তুল মুকাদ্দাস আসেন। তার তিলাওয়াত ছিল সুমধুর। তিনি শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে নামাযে দাঁড়ালে তার পিছনে এক লোক এসে দাঁড়ায়, তারপর তার সাথে তৃতীয় জন এসে যোগ দেয়, তারপর চতুর্থ জন। তিনি নামায শেষ করার আগেই বিরাট একদল লোক এসে তার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে।

পরবর্তী বছর এলে, তার সাথে অনেকেই যোগ দেয় ও নামায আদায় করে। এতে করে মাসজিদুল আক্‌সাতে এ নামাযের প্রথা চালু হয়। কালক্রমে এ নামায এমনভাবে আদায় হতে লাগে যে অনেকেই তা সুন্নাত মনে করতে শুরু করে। (ত্বারতুসীঃ হাওয়াদেস ও বিদ‘আ পৃঃ১২১, ১২২, ইবনে কাসীরঃ বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৪/২৪৭, ইবনুল কাইয়েমঃ আল-মানারুল মুনিফ পৃঃ৯৯)।

এ নামাযের পদ্ধতি

প্রথা অনুযায়ী এ নামাযের পদ্ধতি হলো, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস দশবার করে পড়ে মোট একশত রাকাত নামায পড়া। যাতে করে সূরা ইখলাস ১০০০ বার পড়া হয়। (এহইয়ায়ে উলুমুদ্দীন (১/২০৩)।

এ ধরণের নামায সম্পূর্ণ বিদ‘আত। কারণ এ ধরণের নামাযের বর্ণনা কোন হাদীসের কিতাবে আসেনি। কোন কোন বইয়ে এ সম্পর্কে যে সকল হাদীস উল্লেখ করা হয় সেগুলো কোন হাদীসের কিতাবে আসেনি। আর তাই আল্লামা ইবনুল জাওযী (মাওদু‘আত ১/১২৭-১৩০), হাফেয ইরাকী (তাখরীজুল এহইয়া), ইমাম নববী (আল-মাজমু‘ ৪/৫৬), আল্লামা আবু শামাহ (আল-বা‘েয়স পৃঃ৩২-৩৬), শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা, (ইকতিদায়ে ছিরাতুল মুস্তাকীম ২/৬২৮), আল্লামা ইবনে ‘আররাক (তানযীহুশ শরীয়াহ ২/৯২), ইবনে হাজার আল-আসকালানী, আল্লামা সূয়ূতী (আল-আমর বিল ইত্তেবা পৃঃ৮১, আল-লাআলিল মাসনূ‘আ ২/৫৭), আল্লামা শাওকানী (ফাওয়ায়েদুল মাজমু‘আ পৃঃ৫১) সহ আরো অনেকেই এ গুলোকে “বানোয়াট হাদীস” বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন।

এ ধরণের নামাযের হুকুম

সঠিক জ্ঞানের অধিকারী আলেমগণের মতে এ ধরণের নামায বিদ‘আত; কেননা এ ধরনের নামায আল্লাহর রাসূলও পড়েননি। তার কোন খলীফাও পড়েননি। সাহাবাগণও পড়েননি। হেদায়াতের ইমাম তথা আবু হানিফা, মালেক, শাফেয়ী, আহমাদ, সাওরী, আওযায়ী, লাইস’সহ অন্যান্যগণ কেউই এ ধরণের নামায পড়েননি বা পড়তে বলেননি।

আর এ ধরণের নামাযের বর্ণনায় যে হাদীসসমূহ কেউ কেউ উল্লেখ করে থাকেন তা উম্মাতের আলেমদের ইজমা অনুযায়ী বানোয়াট। (এর জন্য দেখুনঃ ইবনে তাইমিয়ার মাজমুল‘ ফাতাওয়া ২৩/১৩১,১৩৩,১৩৪, ইকতিদায়ে ছিরাতে মুস্তাকীম ২/৬২৮, আবু শামাহঃ আল-বা‘য়েছ পৃঃ ৩২-৩৬, রশীদ রিদাঃ ফাতাওয়া ১/২৮, আলী মাহফুজ, ইবদা‘ পৃঃ২৮৬,২৮৮, ইবনে বাযঃ আত্‌তাহযীর মিনাল বিদ‘আ পৃঃ১১-১৬)।

# শা‘বানের মধ্যরাত্রির পরদিন কি রোযা রাখা যাবে?

উত্তরঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বহু সহীহ হাদীসে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি শা‘বান মাসে সবচেয়ে বেশী রোযা রাখতেন। (এর জন্য দেখুনঃ বুখারী, হাদীস নং ১৯৬৯, ১৯৭০, মুসলিম, হাদীস নং ১১৫৬, ১১৬১, মুসনাদে আহমাদ ৬/১৮৮, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৪৩১, সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস নং ২০৭৭, সুনানে তিরমিঝি, হাদীস নং ৬৫৭)।

সে হিসাবে যদি কেউ শা‘বান মাসে রোযা রাখেন তবে তা হবে সুন্নাত। শাবান মাসের শেষ দিন ছাড়া বাকী যে কোন দিন রোযা রাখা জায়েয বা সওয়াবের কাজ। তবে রোজা রাখার সময় মনে করতে হবে যে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেহেতু শা‘বান মাসে রোজা রেখেছিলেন তাকে অনুসরন করে রোযা রাখা হচ্ছে।

অথবা যদি কারও আইয়ামে বিদের নফল রোযা তথা মাসের ১৩,১৪,১৫ এ তিনদিন রোযা রাখার নিয়ম থাকে তিনিও রোযা রাখতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র শা‘বানের পনের তারিখ রোযা রাখা বিদ‘আত হবে। কারণ শরীয়তে এ রোযার কোন ভিত্তি নেই।

কিছু প্রয়োজনীয় লেকচার যদি আরও জানতে চান- 

পর্ব-১   পর্ব-২  (ইউটিউব থেকে)

বই পড়তে পারেন- 

শাবানের ১৫তম রজনী উদযাপন, শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি 

সন্দেহজনক নফল আমল থেকে দূরে থাকা উত্তম

যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই যে, শবে বরাত শরি’য়ীভাবে প্রমাণিত, তাহলে উহার মর্যাদা কতটুকু হবে? বেশি হলে মুস্তাহাব। কেউ যদি সারা জীবন মুস্তাহাব শবে বরাতটা বর্জন করে তাহলে তার কি ক্ষতি হবে? কিন্তু এটা যদি বিদ’আত হয়, আর যারা এর দিকে মানুষকে আহবান করল, উৎসাহিত করল, মানুষকে বিভ্রান্ত হতে প্ররোচিত করল, আকিদা বিশ্বাসে বিকৃতি ঘটালো, এর প্রচার ও প্রসারে ভুমিকা রাখল তাহলে তাদের পরিনাম কি হবে? একটু ভেবে দেখবেন কি?

অনেকে আছেন যারা বিদ’আত সম্পর্কে জানেন না, একটি বইয়ের লিঙ্ক দিচ্ছি পড়ে দেখুন। আশা করি বিদ’আত নিয়ে কনসেপ্ট ক্লিয়ার হবে। এ বইয়ে বিদআত ও বিদআতীর নিন্দা, বিদআতের সংজ্ঞা, বিদআতের বিভিন্ন প্রকার, বিদআতীর সঙ্গ, বিদআতীর প্রতি পূর্বপুরুষদের ভূমিকা, বিদআত সৃষ্টির কারণ, বিদআত ও বিদআতীর পরিণাম, বিদআত চেনার নীতিমালা, প্রচলিত বিদআতের কিছু নমুনা ও বিদআত প্রতিরোধ করার বিভিন্ন বিষয়ে খুব সুন্দর আলোচনা করা হয়েছে।

বই-  বিদ’আত দর্পণ 

অবশেষে উপরোক্ত আলোচনা ( পর্ব-১ এবং পর্ব-২) থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, কুরআন, হাদীস ও গ্রহণযোগ্য আলেমদের বাণী থেকে আমরা জানতে পারলাম শা‘বানের মধ্য রাত্রিকে ঘটা করে উদযাপন করা— চাই তা নামাযের মাধ্যমে হোক অথবা অন্য কোন ইবাদতের মাধ্যেমে— অধিকাংশ আলেমদের মতে জঘন্যতম বিদ‘আত। শরীয়তে যার কোন ভিত্তি নেই। বরং তা’ সাহাবাদের যুগের পরে প্রথম শুরু হয়েছিল। যারা সত্যের অনুসরণ করতে চায় তাদের জন্য দ্বীনের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা করতে বলেছেন তাই যথেষ্ট।

আল্লাহ আমাদেরকে কুর’আন ও সুন্নাহ মোতাবেক এবং তাঁর রাসূলের (সাঃ) পরিপূর্ণ পদাঙ্ক অনুসরন করে চলার তৌফিক দিন। আমীন।

(সমাপ্ত)

Reference: Islam QA  Islam House.com  কুরআনের আলো  Kalamullah.com  ihadis  Zekr

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s