স্বপ্ন রহস্য

 

১.

বন্ধু যশ কয়দিন ধরে আমাকে ম্যাগাজিনে লেখা দেওয়ার জন্য চাপাচাপি করছে। সময় সংকীর্ণতার কারণে তা হয়ে উঠছে না। ভাবছি একটা গল্প লিখবো। তাই কাহিনী ভাবতে লাগলাম। কোন প্লটই মাথা থেকে আসছে না। কি করি? লেখা জমা দেওয়ার দিনটাও আবার ঘনিয়ে আসছে। আমার পরাবস্তু শীর্ষক ধারণাটি টয়লেটে থাকাকালীন এসেছিল। তাই টয়লেটে যাওয়াই এখন একমাত্র সমাধান। তো টয়লেটে চলে গেলাম। বসে আছি। চিন্তা করছি। বের হয়ে গেল!

একটা প্লট দাঁড়া করালাম। গতকাল এস্ত্রবয় নামক একটা এনিমেটেড মুভি দেখেছি। খেয়াল করলাম, প্লটটি ঐ মুভি দ্বারা প্রভাবিত। এত চিন্তা করে একটা প্লট যখন মাথায় এনেছি তখন লিখে ফেলব বলে ঠিক করলাম। তো লেখা শুরু করলাম। এক পাতা লেখার পর খেয়াল করলাম, আমার লেখাটা জহির রায়হান কর্তৃক প্রভাবিত। কারন খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে পেয়ে গেলাম। মাসখানেক আগে যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল তখন জহির রায়হান এর ছোট গল্প ‘সময়ের প্রয়োজনে’ পড়েছিলাম। একসময় মাথায় ভূত চেপে বসল- এটার উপর একটা ডকুমেন্টারি টাইপ মুভি বানাবো। ছবিপাগল কতক বন্ধুর সাথে আলোচনা করার পর বুঝলাম কাহিনীর প্রেক্ষাপট ফুটিয়ে তোলার মত রসদ এই মুহূর্তে আমার হাতে নেই। তাই এই প্রজেক্ট বাদ দিতে হল। আজ কাহিনী লেখার সময় সে কথা মনে পড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত যদি লেখাটা ঐ পথে Divert করে তাহলে এটাও বাতিল করতে হবে। সব কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে পণ করলাম আমাকে লেখাটা শেষ করতেই হবে। এক পর্যায়ে খুব ঝিমুনি আসছিল। তাই চোখেমুখে পানি দিয়ে আবার লিখতে বসলাম।

 

২.

প্রচণ্ড সূর্যালোক। চোখ ধাঁধানো আলো। চোখ খুলে তাকাতে পারছিনা। অনুভব করলাম আমার হাতে পায়ে ব্যাথা। কষ্ট হল খুব, কোনোমতে উঠে দাঁড়ালাম। চারদিকে তাকিয়ে দেখি- যেদিক চোখ যায় শুধু বালু আর বালু। আরে! এটা তো মরুভুমি। আমি এখানে কিভাবে আসলাম? তখনই কাছে কোন এক জায়গায় বাজ পড়ার মত শব্দ হল। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি বিশাল বড় একটা বাইভার্বাল পড়ে আছে আর সেটা হতে অতিকায় একটা রোবট বের হয়ে আসছে। মনের মধ্যে কৌতূহল জাগল। যাই রোবটটার সাথে হাত মিলিয়ে আসি। যেই না কাছে গেলাম হাত মিলাতে আর ওমনি রোবটটা তার অতিকায় মুষ্টি দিয়ে আমাকে দিল এক ঘুষি। লক্ষ্য করলাম, আমি হাওয়ায় ভাসছি। অনেক দূরে গিয়ে পড়লাম কিন্তু কোন ব্যাথা অনুভব করলাম না। আরে! আমার পায়ের নিচ দিয়ে যে আগুন বের হচ্ছে। এবার পোশাকের দিকে খেয়াল করলাম। কমান্ডো টাইপ স্যুট। অবাক হলাম! ওদিকে রোবটটি মাটি কাঁপিয়ে থপ থপ শব্দ ফেলে আমার দিকে ছুটে আসছে। কাঁধে কিছু একটা অনুভব করলাম। হাত দিতেই দেখি, একটা এটমিক ব্লাস্টার। চালাতে তো পারিনা। কি করব? ট্রিগার টেনে সুইচ প্রেস করলাম আন্দাজে। নিয়টনের ৩য় সূত্র খাটল আমার উপর, কয়েকগজ দূরে গিয়ে পড়লাম। দেখি রোবটের এক হাত ও এক পা উড়ে গেছে। আর সেখান হতে আরেকটা হাত-পা গজাচ্ছে। কি ভয়ানক কাণ্ড! এটা তো যান্ত্রিক হাইড্রা। ভীত হয়ে দৌড়াতে লাগলাম। নিজেকে এখন উসাইন বোল্টের মত মনে হচ্ছে। ঝড়ের বেগে ছুটছি আমি। পিছনে রোবটটিও ছুটে আসছে। সামনে একটা জায়গাকে জলাভূমির মত মনে হল। আসলে এটা মরীচিকা। প্রচণ্ড এক ধরনের আকর্ষণ অনুভব করলাম। চোখের সামনে অনেক ধরনের রং খেলা করছে। তারপর আর কিছু মনে নেই।

 

৩.

যখন জ্ঞান ফিরল তখন মুখে নোনা পানির গন্ধ পেলাম। চোখ খুলতে পারছি না। প্রচণ্ড পানির স্রোত আমার দিকে ছুটে আসছে। বিশাল বিশাল ঢেউ আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাঁতার কাটার চেষ্টা করলাম। শরীরে শক্তি নাই। প্রাণ বাঁচাতে হবে। স্পষ্ট মনে আছে কিছুক্ষন আগে আমি মরুভূমিতে ছিলাম আর এখন সমুদ্রের নোনা পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছি। অতিকষ্টে সাঁতরে তীরে এসে পৌঁছলাম। বাচ্চার আওয়াজ শুনলাম। শরীরের সব জায়গায় ব্যাথা। তবুও কষ্ট করে উঠে দাঁড়ালাম। দেখালাম কিছুটা দূরে দুইটি ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চা বালি দিয়ে ঘর বানাচ্ছে। আর তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। তারা পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ধাক্কা খেলাম। লোকটা ঠিক আমার মত দেখতে। মনের মাঝে কৌতূহল জমল। এগিয়ে গেলাম তাদের দিকে। আমি এগিয়ে আসছি দেখে বাচ্চাগুলো অপরিচিত ভেবে কান্না জুড়ে দিল। ছেলেটি ভীত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,’আপনি ঠিক আমার মত!’ ‘হ্যাঁ,আমিও অবাক হচ্ছি, কে তুমি?’ জিজ্ঞেস করলাম। ‘আমাকে আপনি চিনবেন না। আমার নাম রুরুবিন। কিন্তু আপনাকে আমি ঠিকই চিনেছি।‘ জিজ্ঞেস করলাম,’কিসে চিনলে?’ ছেলেটি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলল,’তাসরেম, ইনি হলেন সেই পরিব্রাজক যিনি আমাকে খুন করতে এক সহস্রাব্দ পার করে ছুটে এসেছেন।‘ আমি তাদের কথায় বিস্মিত হলাম এবং বুঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি তাদের মারতে আসিনি। হাতে কোন প্রমানও নাই কি করি? দেখলাম তাসরেম একটা লেজার সোর্ড নিয়ে এসেছে। আমার দিকে উঁচিয়ে ধরেছে। রুরুবিন বললো,’এটা আমাদের পৃথিবী, এখানে আপনার মত আদিম কোন মানুষের থাকার কোন অধিকার নাই।‘ এই কথা যখনি ও বলা শেষ করল ঠিক তখন দেখলাম তীরের সব অট্টালিকা আপনাআপনি ভেঙ্গে পড়তে লাগলো। মেয়েটি আর্তনাদ করে উঠল। জোরে জোরে বাতাস বইতে লাগলো, যেন আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ‘না এখনি আপনাকে মেরে ফেলতে হবে, না হলে এই প্রলয়কাণ্ড শেষ হবে না‘ রুরুবিন বলল। কথা শেষ না হতেই দেখলাম,সামনে বড় বড় ঢেউ আমাদের দিকে ছুটে আসছে। একটু পরেই তা আমাদের গ্রাস করল। রুরুবিন ও তাসরেমের আর্তনাদ শুনলাম,’না’। আমি জ্ঞান হারালাম।

৪.

প্রচণ্ড কাঁপুনিতে জেগে উঠলাম আমি। মনে হল ভূমিকম্প হচ্ছে। একটা গোলাকার সাদা ঘর। একটি চেয়ারে আমি বসে আছি। আমার সামনে সাদাপাকা চুলের একটি লোক বসে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,’কেমন লাগলো, শার্প তাই না?’ আমি তখনও ঘুমের ঘোরে। ঘুমকাতুরে গলায় বললাম ‘কোথায় আমি?’ লোকটি প্রশ্নটি এড়িয়ে জবাব দিল,’তুমি অনেকদিন ধরে ঘুমুচ্ছ, তোমাকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে।

-আমার কি হয়েছিল? – জিজ্ঞেস করলাম তাকে।

-তুমি টাইম কনটিনিউয়ামে আটকে ছিলে অনেকদিন, যা সময়ের একটি জটিল দশা বলতে পার – লোকটি বলল।

-এটা কি একটা স্বপ্ন? আমি কি স্বপ্ন দেখছি?

-বলতে পার, এটা হল জীবন ও মৃত্যুর ঠিক মাঝামাঝি একটি পর্যায়।

আমার কেন জানি মনে হল আমি পৃথিবীতে নাই, মরে গেছি- তাই জিজ্ঞেস করলাম, আমি কি বেঁচে আছি?

-হ্যাঁ, তুমি স্বপ্নের পৃথিবীতে বেঁচে আছো।

-আমাকে আমার পৃথিবীতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিন। আমি এখানে থাকতে চাই না।

-না এখন সেটা সম্ভব নয়। তুমি সহস্রাব্দ কাল ধরে এখানে আছো, তুমি যদি এখন পৃথিবীতে ফিরে যাও তাহলে তা প্রকৃতি সহ্য করবে না।

-কে কি সহ্য করল কি করল না তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আমি এখানে থাকতে চাই না।

-তুমি না চাইলেও তোমাকে থাকতে হবে। তোমাকে মুক্তমানুষ হতে হবে।

-মুক্তমানুষ! দেখেন, মানুষ আছি ভাল আছি, ওসব হতে চাই না।

-দেখ,তুমি সময়কে স্থির করতে গিয়ে একটি স্পাইরাল লুপে আটকা পড়েছিলে। পৃথিবীর বয়স এখন সহস্রাব্দ বছর বেড়ে গেছে। তুমি বরঞ্চ এই স্বপ্নের পৃথিবীতে থেকে যাও।

-স্বপ্ন শুধুই মায়া। এর কোন ভিত্তি নাই। এই অলীক পরিবেশে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাবো।

-দেখো, তুমি অনেক স্তর পেরিয়ে এসেছ, ক্লান্ত তুমি। সময় নাও, সিদ্ধান্ত নাও, কি করবে তুমি?

-আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল।

-এখানে তুমি তোমার মনের মানুষকে পাশে পাবে, স্বপ্নের পৃথিবীতে মুক্তমানুষ হয়ে সুখের নীড় রচনা করবে।

-আমি কিছুই চাই না, পৃথিবীতে ফিরে যেতে চাই।

-তাহলে এটাই তোমার সিদ্ধান্ত।

-হ্যাঁ।

-তবে তাই হোক।

মাথার পেছনে তীব্র আঘাত অনুভব করলাম। জ্ঞান হারালাম।

 

৫.

‘এই উঠ, ভার্সিটি যাবি না?’ মায়ের ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙ্গল আমার। ‘সারারাত ধরে টেবিলেই ঘুমাচ্ছিস, কি লিখছিলি ছাইপাশ?’ ‘ও কিছুনা আম্মু, ম্যাগাজিনের জন্য গল্প লিখতে বসেছিলাম রাত্রে, ধুর শেষ করতে পারলাম না, আজকে লাস্ট ডেট জমা দেওয়ার’ –ঘুমকাতুরে গলায় বললাম আমি। ‘যা তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নে, সাতটা বেজে গেছে’ –আম্মু একথা বলে চলে গেলেন। ঘুমটা যায়নি মোটেই। বিড়বিড় করে বললাম, ‘ধুর, লাকটাই খারাপ।‘ তারপর গল্পের কাগজটা হাতে তুলে নিলাম।

মোটেই বিশ্বাস হচ্ছেনা। হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে। হাতড়িয়ে চশমাটা তুলে নিলাম, রাতে নিচে পড়ে গিয়েছিল। চশমাটা পড়লাম। আবার স্বপ্ন দেখছিনা তো কোন। চিমটি কাটলাম হাতে। না জেগেই আছি। ভুল দেখছি না। স্বপ্নে যা দেখলাম আদ্যোপান্ত তাই লেখা কাগজে। কে লিখল এগুলো? আমি লিখেছি! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম গল্পটার দিকে।

************************

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s