চারপাশের পরিবেশ ও নিজস্ব কিছু কথা

১৯ টি বসন্ত পেরিয়ে ২০ এ পা দিব আর কয়দিন পর। কিছুদিন ধরে ভাবছিলাম আমি এই ১৯ টি বসন্তকে নিয়ে পর্যালোচনা করব। কত কিছু দেখলাম, কত কিসিমের মানুষ দেখলাম- সব লিখবো। কয়দিন ধরে মনের মধ্যে একধরনের ভয় দানা বাঁধতে শুরু করেছে, নিজের কয়েকটি সাম্প্রতিক লেখার উপর এর প্রভাব পড়েছে আবার। বারবার আমার মনে হচ্ছে, এই যে ২০ টি বসন্ত পাড়ি দিলাম, ভবিষ্যতে বোধ হয় এইরকম আরেকটি ২০ বসন্ত উদযাপন করতে পারব না। তাই নিজেকে মূল্যায়ন করতে বসে পড়লাম আর বাকি যে কয়টা বছর আছে তাতে কি করা যায় তার পরিকল্পনা করা শুরু করলাম। আমার চারপাশের পরিবেশ নিয়ে বলার আগে আপনাদেরকে আমার নিজের সম্পর্কে একটু ধারণা দিই। আমি মানুষটা আমার চোখে কি রকম? কোন রকম বাড়িয়ে বলব না যেমন, তেমনি কোন জিনিস গোপন ও করবনা।

আমি মানুষটা একটু স্বপ্নবিলাসি টাইপের। প্রচুর স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি, কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়ন খুব কমই হয়। আমি কল্পনা করতে ভালোবাসি। আমি মনে করি যে এই যে আর কয়টা দিন বাঁচব, সেই দিনগুলিতে আমি এমন কিছু করে যেতে পারব যা দিয়ে পৃথিবীবাসীর উপকার সাধন হবে, আমার দেশেরও উপকার হবে। আমি যখন থাকব না তখন আমার কর্ম দেখে মানুষ আমাকে স্মরন করবে- এটাই আমি চাই। আমার একটা Wildest Dream আছে আর তা হল- বিখ্যাত টাইপের একজন বিজ্ঞানী হয়ে দেশের জন্য একটা নোবেল নিয়ে আসা। তা যেকোনো বিষয়েই হতে পারে। এমন এক জিনিস আবিষ্কার করব যা আগে এই মর্ত্যবাসী চর্মচক্ষে দেখে নাই। বলছিলাম স্বপ্নের কথা, এবার বলি কল্পনার কথা। এই কল্পনার পিছে পিছে আমার মাথায় সর্বদা ঘোরাফেরা করে Innovative সব Idea. যখন ক্লাস সেভেনে পরি, তখন একদিন এক বন্ধু আমাকে একটা জিনিস দেখায়- বলতে পারি ওইটাই আমার সবকিছুর শুরু। আমার পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে কোন ধারনাই ছিলনা, আমার ঐ বন্ধুর প্রস্তাবে কাজে লেগে পরি। কয়দিনের মধ্যেই ওইটাকে আরও develop করি। নতুন কিছু বানিয়েছি এই আনন্দে তখন আমি ও আমার সেই বন্ধু দিশেহারা। স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের কাছে নিয়ে গেলাম ওইটার একটা Model- Practically করে দেখালাম ওনাকে। স্যার আমাদের হতাশ করে বললেন, ‘কোত্থেকে এটা তুলে নিয়ে এসেছ, এটা তো অনেক আগেই হয়ে গেছে’। এর পর আমি এটার সম্পর্কে জানতে পারি উচ্চমাধ্যমিকে। জিনিষটার নাম ‘হুকের সূত্র’! আমি কিন্তু হতাশ হইনি। সেদিন ঐ ঘটনা আমার মধ্যে রোপণ করেছিল ‘নতুন কিছু আবিষ্কার’ এর বীজ।

শুধুই তো গুণের কথা বলছি এইবার আমার কিছু দোষের কথা শুনুন। আমার একটি বদভ্যাস হল আমি কোন একটা জিনিস শুরু করলে ওইটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওইটার পিছে লেগে থাকি। অমানুষিক পরিশ্রম আর কি! যেটা দেখি আমার আয়ত্তের বাইরে সেটা নিয়ে আর আগাই না।  এই কারণে আমি সেভেনের ঐ মডেল টা ৪ সপ্তাহে দাঁড়া করাতে পেরেছিলাম। যেটা ভাল পারি- সেটা খুব ভাল পারি, আর যেটা বুঝিনা সেটা পারিই না। আর খুব পরিশ্রম করতে পারি আমি। এর অনেক দৃষ্টান্ত আছে আমার স্কুল আর কলেজ লাইফে। অনেক প্রফেসর বলেন সবার মেধা সমান না। আমি এইটা বিশ্বাসই করি না। আমি কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। আর মেধা বলে যদি কিছু থেকেও থাকে, আমি মনে করি মহান আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে সেটা সমানভাবে দিয়েছেন। আমরা কেউ সেটা কাজে লাগাতে পারছি, আর কেউ কেউ পারছিনা। আমি উচ্চমাধ্যমিকের পর একবার গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে কিছুদিন ছেলে-পেলেদের পড়িয়েছিলাম। দেখলাম তাদের মধ্যে আমার মত সমমেধা রয়েছে- ওরা পরিশ্রমও করে। কিন্তু পারছেনা কেন? আমি বলব- কোন কাজে সাফল্যের জন্য লাগে সহায়ক পরিবেশ। ওরা আমাদের মত শিক্ষার পরিবেশ পাচ্ছেনা  বিধায় এগুতে পারছেনা।

আপনারা হয়ত একটু খেয়াল করে দেখেছেন- আমি লাফিয়ে লাফিয়ে এক জায়গা হতে জায়গা থেকে চলে যাচ্ছি। লেখে যাচ্ছি। এটা আমার একটা দোষ। বলতে পারেন- যা মাথায় আসে তাই লিখে ফেলি। একটু মুক্ত টাইপের কথাবার্তা বলি। আমার স্মৃতিশক্তি আবার একটু কম। এজন্য যা মনে চায় তাই লিখে ফেলি। যেদিন রাতে স্বপ্ন দেখি সকালে ঘুম থেকে উঠেই তা মনে থাকতে থাকতে আমার একটা ডায়েরী আছে ওটাতে লিখে ফেলি। Hobby বলতে পারেন। আরও কিছু আছে যেমন- ছবি আঁকা, অবসরে জাফর ইকবাল স্যারের সাইন্স ফিকশন বই পড়া, গল্প লেখা। প্রচুর গল্প ও কবিতা লিখেছি এককালে, খাতার পর খাতা। মা সব পড়তেন আর বলতেন, ‘কি ছাইপাশ লিখিস এইসব’! ওইসব গল্পের খাতা মা ফেলে দিয়েছেন- এখন কোথায় আছে কে জানে? মাঝে মাঝে অনেকে বলে- আমি নাকি ভাল লিখি! মাও বলেছেন। এর একটা ভাল স্বীকৃতি পেয়েছি কলেজে থাকতে। আমার এক বন্ধুর বাবার বন্ধু হলেন জাফর ইকবাল স্যার। বন্ধুর বদৌলতে একদিন দেখা হয় ওনার সাথে। মেলে ধরেছিলাম আমার গল্পের খাতা ওনার সামনে। ভাবছিলুম উনিও হয়ত বলবেন,‘কি ছাইপাশ লিখো এইসব’! না, উনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলেন ‘আদিব, বেশ ভাল হয়েছে লেখাগুলো, চালিয়ে যাও, ভাল করবে সামনে’। এর চেয়ে বড় আর কিছু লাগে নাকি? এটাও আমাকে ভালই উৎসাহ দেয়। আরেকটা বদভ্যাস হল প্রচুর ঘুমাই। একবার ঘুমাইলে আর উঠতে পারিনা। সামনে যদি বোমাও পড়ে তারপরেও মনে হয়, আমার ঘুম ভাঙবেনা। প্রিয় বিষয় হল গণিত, পদার্থবিজ্ঞান আর জ্যোতির্বিদ্যা। ছেলেবেলায় গনিতে খুব কাঁচা ছিলাম। ঐ যে বলেছি লেগে থাকি পিছে, আমি গনিতের পিছে লেগেছিলাম। একবার গনিতে ফেল করি, তো পাস করার জন্য পরের টার্মে লাগে ৯২ নম্বর। ফাইনালে আমি কত পেয়েছিলাম জানেন? ৯৬। সেদিন ক্লাস টিচার আমাকে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে বলেছিলেন ‘পরিশ্রম করলে যে ফসল ঘরে তোলা যায়, আদিব তার জ্বলন্ত প্রমাণ’। সেইদিন আমার দুচোখ বেয়ে আনন্দের অশ্রুধারা নেমেছিল। আমার পছন্দের মানুষ হল যে আমাকে ভাল বুঝে, আমার সমালোচনা করে আর আমায় ভালোবাসে। আমার বন্ধু সংখ্যা অনেক, যার সাথে মিশি তাকেই বন্ধু বলে গননা করি। কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে হাতেগোনা কয়জন। তারা আজ অনেক দূরে কিন্তু আমাদের বন্ধুত্তের বন্ধন কিন্তু ভাঙ্ঘেনি।  কয়েকজন আবার আমার আশেপাশেই আছেন, তাদের কথা নাই বললাম।

যখন কলেজে পড়ি তখন মাথায় চেপে বসে এক ভূত, নাম তার String Theory. সাথে সাথে সময় নিয়ে কত যে চিন্তাভাবনা। কলেজে আমার এক প্রিয় প্রফেসর ছিলেন- তার সহায়তায় কতগুলো ভাল ভাল লিংক পেলাম। শুরু হয়ে যায় এটা নিয়ে ‘গো+এষনা’। মাথা খারাপ যাকে বলে, একদিন তো বন্ধু বলেই ফেলল- ‘আরে আদিব তুই তো নোবেল পেয়ে যাবি রে’। ও ওটা ঠাট্টা করে বলে নাই, ওর চোখে দেখেছিলাম Seriously বলেছে ও। নাহ, সময় নষ্ট হয় নাই, কত কিছু শিখলাম। আমি মনে করি, আমি দুনিয়ায় এসেছি শিখতে। জ্ঞান অর্জন করতে। আমি মনে করি আমার মধ্যে আছে Theoretical Power, Practically খুব কমই apply করতে পেরেছি আমি। এই প্রয়োগ কিভাবে করতে হয় এটাই আমি শিখছি আশেপাশের পরিবেশ থেকে, মানুষের কাছ থেকে। নিজেকে সৎচরিত্রবান বলতে পারবে এইরকম খুব কম লোক আছেন এই সমাজে। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, আমি এখন পর্যন্ত সৎভাবে যেমন চলতে চেয়েছি, মহান আল্লাহ আমাকে তার তৌফীক দিয়েছেন। চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখলে রুখে দিই তা। খারাপ কাজ একেবারেই দেখতে পারিনা, আশেপাশের অনেক মানুষ আছে যারা আমার চেয়ে ক্ষমতাবান, তারা যখন অন্যায় করে তখন সাধ্যমত প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করি। সবসময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করি।

প্রিয় ডায়লগ হল ‘নিজেকে আগে ভালবাসতে শিখো, তারপর অন্যকে ভালবেসো’। আমি নিজেকে খুবই ভালোবাসি। পরিবার, বন্ধুবান্ধবদেরও খুব ভালোবাসি। যে সব লোক অপরের অনিষ্ট করে বেরায় তাদের দেখতেই পারি না।  অনেকে আছে মুখে এক কথা ভিতরে ভিতরে খুব খারাপ- এইসব পাবলিকদের তো দেখতেই পারিনা। সমাজে এইসবের সংখ্যাই বেশি। কিছু মানুষ আছে যাদের মুখে লাগাম নাই, যেখানে সেখানে উল্টা পাল্টা বলেই যাচ্ছে, বলার সময় খেয়ালই নাই যে তার আশেপাশের মানুষ তাকে নিয়ে কি ভাবছে? নিজেকে মহান ভেবে দোকানের দোকানদার কিংবা রিকশাওয়ালার সাথে এরা খারাপ ব্যবহার করছে, ওর বিন্দুমাত্র ধারণা নাই যে ওদেরও একটা সত্ত্বা আছে তোমার মত। যাকে পাচ্ছে তাকে ধরে গালিগালাজ করছে, প্যাঁচ লাগাচ্ছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। আমার সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন কেউ পরিবার নিয়ে প্রশ্ন তুলে, তাদের কি মনে থাকেনা যে তারও একটা পরিবার আছে- বাবা-মা আছে, আছে ভাই-বোন। রাস্তায় একটি মেয়ে হেটে গেলেই তার দিকে কুদৃষ্টি দেয়। আমি বলি- ওরে অধম তোর ঘরে কি ছোট বোন নাই, ওর কথা চিন্তা করলেই তো হয়। এইসব কুপ্রবৃত্তি জাগেনা। তোমার বোনকে যখন কেউ এমন করবে, কেউ তোমার মত করে চিন্তা করবে, তখন তোমার কেমন লাগবে? ফেসবুক হল সামাজিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম। সেখানেও এইসব চলে। নানান ধরনের পেইজ খোলা হয়েছে সেখানে, নানা ধরনের আপত্তিকর ছবিও আছে। Honestly speaking আমিও তাতে ঢু মারি, দেখি সমাজটা কোনদিকে যাচ্ছে। আমাদের মা-বোন দের নিয়ে যে কি করছে তারা, কল্পনাতীত। সাথে সাথে সমালোচনা করব ঐ সব ফেইক আইডির, যারা মেয়ের ছবি দিয়ে রাখে, কিন্তু বান্দা হলেন ছেলে। ধিক! তাকে। কত শত কমেন্ট পড়ে সেখানে, আমরা কিন্তু পড়ে পড়ে ঠিকই মজা লুটি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি কাজ তা কি সঠিক? তাই পাঠকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, don’t like those pages. আর নিজেকে যে বড় মনে করে সে কিন্তু কখনোই বড় হতে পারবেনা। আমার আশেপাশেই এইসব লোক ছড়িয়ে আছে।

সমাজে যেমন খারাপ আছে, তেমন আছে ভাল লোক- সাদা মনের মানুষ। তারা ভাল কাজ করছেন, করবেন। মানুষের পাশে এসে দারিয়েছেন তারা। অনেকে আছে খুব সহজ সরল, তাদের দিক বিভ্রান্ত করছে ওইসব খারাপ লোক গুলো, demoralize করছে, আবার কখন বাঁশ দিচ্ছে। তারপরেও কিন্তু ভাল যারা তারা পিছপা হয়না। তারাই পারবেন আগামীর সুন্দর কলুসমুক্ত সমাজ গড়তে।

অনেক কথা লিখলাম। অনেক কথা চেপে ছিল এতদিন। বের হয়ে গেল। আর কয়দিন বাঁচব জানিনা, কিন্তু এমন কাজ করে যেতে চাই যাতে ভবিষ্যতে মানুষ আমাকে মনে রাখে। আমি আমার আশেপাশের বন্ধুদের অনেক ভালোবাসি, তাদের জন্যই তো বেঁচে আছি, লেখে যাচ্ছি। আর যতদিন বেঁচে থাকব তাদের ভালোবাসা বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।

সবশেষে বলি বন্ধুরা সর্বদা নিজেকে ভালবাসবে, মানুষকে ভালবাসবে আর আমাদের এই প্রিয় দেশটাকে ভালবাসবে।

 

One thought on “চারপাশের পরিবেশ ও নিজস্ব কিছু কথা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s