বস্তু ও পরা-বস্তু বিষয়ক ভাবনা

   আমরা আমাদের চারপাশে যে জগতটা দেখি এটা হল বস্তুজগত। কারণ এই জগতটা অনেক বস্তু নিয়ে গঠিত। এই বস্তুজগতটা তিনটি মাত্রার সমষ্টি নিয়ে গঠিত। তিনটি মাত্রা হল দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা। আমরা যদি আমাদের চারপাশে ভালোভাবে তাকাই তাহলে দেখবো প্রতিটি বস্তুই এই তিনমাত্রায় গঠিত। সবারই দৈর্ঘ্য আছে, প্রস্থ আছে এবং আছে উচ্চতা। এগুলোর মানে হল সবই ত্রিমাত্রিক। আর আমরা এক্তি ত্রিমাত্রিক বস্তুজগতে বসবাস করি। আরেকটা ব্যাপার আছে টা হল সময়। এটাকে যদি মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে তো জগতটাকে চতুর্মাত্রিকই ধরতে হয় তাই না? কিন্তু আমরা কি হিসেবের সময় দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার পাশাপাশি সময় (time) টাকে বিবেচনা করি ? করি না। কিন্তু এই সময় দেখেই কিন্তু আমরা আমাদের জীবন পরিচালনা করি। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে , আপেক্ষিকভাবে আমরা একটি চতুর্মাত্রিক বস্তুজগতে বসবাস করছি। আমাদের চোখে আমরা হল ত্রিমাত্রিক জীব, আর সময় যদি বিবেচনা করি তাহলে… চতুর্মাত্রিক ? এই প্রশ্ন আপেক্ষিক। আপেক্ষিক-ই থাক। আমরা চিন্তার বেলায় এটি আপেক্ষিকভাবেই ধরব। তাহলে বুঝা যাচ্ছে, এটি আমাদের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার উর্ধেব। কারন যখনই আমরা আমাদের নিজেদেরকে চতুর্মাত্রিক জীব বলে কল্পনা করছি ঠিক তখনই টা বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করতে পারছিনা, করছি আপেক্ষিকভাবে! এইরকম অনেক কিছুই কিন্তু আমরা পারি না!

       বলছিলাম বস্তুজগতের কথা। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দুইটি জগতে বিভক্ত। একটি বস্তুজগত আরেকটি পরা-বস্তুজগত। আমরা বস্তুজগতে বাস করি বলে পরা-বস্তুজগতের সন্ধান পাই না। এবং ওটার সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান নেই বললেই চলে। পদার্থবিজ্ঞানীরা পরা-বস্তুজগত সম্পর্কে অনেক গবেষণা করছেন, ভবিষ্যতেও করবেন। তাঁরা নানা থিওরেম দিয়েছেন যা আমাদের মত সাধারন মানুষের কাছে বোঝা দুরহ। মানুষের কল্পনাশক্তি প্রখর, এটা আমরা জানি। আমরা কিন্তু প্রচুর চিন্তাও করি। আর বিজ্ঞানীরা এই চিন্তাভাবনা করে, কল্পনাশক্তিকে ব্যবহার করেই কিন্তু এইসব থিওরেম দিয়েছেন। আমরা কি পারিনা এই সম্পর্কে একটু চিন্তা করতে? এবং তা নিজস্ব কল্পনাশক্তির মাধ্যমে। অবশ্যই পারি। তা হলে আসুন একটু চিন্তা করি।

          কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছিনা!

আচ্ছা, আমরা কি? আমরা কি সেটা জানি? অনেকেই সেটা সোজাসাপটাভাবে বলে দেবে- আমরা মানুষ। হুম। এতাই কি যথার্থ উত্তর? একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখবো আমরা কিন্তু একেকটা বস্তু। এই যে আমাদের যে শারীরিক গঠন টা অনেকগুলো বস্তুর সমষ্টি- তাই নয় কি? আমরা কি নিজেদের শক্তি বলে দাবী করতে পারি? পদার্থবিজ্ঞান কি বলে? ‘শক্তির কোনো সৃষ্টি বা বিনাশ নাই’। আমাদের ক্ষেত্রে কি সেটা খাটে? না। আমাদের সৃষ্টি আছে। একসময় ধ্বংসও হয়ে যাবো। ধ্বংসের কথা পরে বলি, আগে সৃষ্টির কথা ধরা যাক। সৃষ্টির সময় আমরা কতটুকু ছিলাম? অনেক ছোট- এবং তাতে কিছু DNA, RNA ছিল। যখন প্রাপ্তবয়স্ক হলাম এখন কত বড়?  দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার পার্থক্য হয়েছে না? তাহলে এখান হতে বুঝা যায়- আমরা একেকটা ত্রিমাত্রিক বস্তু (শক্তি যেহেতু নই)। আচ্ছা এবার ধ্বংসের কথায় আসি। শক্তির বেলায় হচ্ছে ধ্বংস, আর আমাদের বস্তুর বেলায় হল মৃত্যু। সৃষ্টি হল জন্ম। বস্তুর বেলায়- তাঁর যেমন জন্ম আছে, মৃত্যুও তেমনি আছে। একদিন না একদিন ঘটবেই। জন্মের পর হতেই বস্তুর বাড়তে থাকে। একসময় তা তার চূড়ান্ত সময়ে পৌঁছে, যারপরে সে আর বাড়তে পারে না। তখন তার মৃত্যু ঘটে। এই যে জন্ম ও  মৃত্যু- মাঝখানে কিছু না কিছু হয়েছে তাই নয় কি? এই কিছুক্ষন হল সময়। তাহলে বস্তুর জীবিতকালে তিনমাত্রার সাথে সময় যদি বিবেচনা করি তাহলে কি দাঁড়ায়- আমরা একটি চতুর্মাত্রিক বস্তু। এবং তা অবশ্যই আমরা জীবিতকালে হিসেব করতে পারি না, কারন আমরা কখনোই জানি না আমরা কতদিন কত সময় ধরে বাঁচবো। তাহলে যখন মৃত্যু হয় বা মৃত্যুকে বিবেচনায় ধরি তখনি কেবলমাত্র আমরা নিজেদের বলতে পারি চতুর্মাত্রিক, তখন সময় জিনিসটা আসে। কিন্তু মৃত্যুর পর কি আমরা তা হিসেব করতে পারি? আমরা তা জানিনা এবং হিসেব করিও না বলেই আমরা ত্রিমাত্রিক। আর আপেক্ষিকভাবে চতুর্মাত্রিকএকটা কথা ত বুঝলাম যে আমরা কোন ধরনের শক্তি নই, আমরা হলাম বস্তু। বস্তুজগতের বাসিন্দা। তাহলে আরেকটা যে জগত আছে- পরাবস্তুজগত, অখানে কারা থাকে? আমরাই থাকি! চমকে গেলাম নাকি? চমকে যাবার মতই উত্তর। আসলে স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে জিনিসটা মাথায় আসে না। তাহলে কি অস্বাভাবিকভাবে চিন্তা করব? না। একটু প্রবলচিন্তা ও কল্পনাশক্তি সেইসাথে লজিক খাটাতে হভে এক্ষেত্রে। তা হলে পরা-বস্তুজগতের কথা শুরু করি কি বলেন?

Previous আলোচনায় বস্তুর জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলাম আমরা। আচ্ছা মৃত্যুর পরে কি হয় তা আমরা কি জানি? না। পদার্থবিজ্ঞান বলে, বস্তুর মৃত্যুর পর অর ধর্মের কিছুই থাকে না। বলা যায় পুরোপুরি বিনাশ হয়, অস্তিত্ব থাকে না। অধিকাংশ পদার্থবিজ্ঞানী-ই নাস্তিক এই কথা শোনা যায়। তারা বস্তুর মৃত্যুর পরের ঘটনাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন-এবং তা ধর্মকে বাদ দিয়ে! আমি আমার আলোচনার সময় ধর্মকে কোনরূপ ঢুকাচ্ছিও না আবার বাদও দিচ্ছিনা। বলতে পারেন ছাড়াছাড়াভাবে রাখছি। বলছিলাম মৃত্যুর পরের কথা। আচ্ছা আমরা যখন জীবিত থাকি তখন অনেক কিছুই চিন্তা করছি এবং তা মস্তিস্ক ব্যবহার করে। মৃত্যুর পর এসব কি কিছু থাকে? কিছুই থাকে না। ধর্ম হতে যদি কিছু নিই তাহলে বলতে পারব আমাদের বস্তুকেন্দ্রিক গঠনটার ধ্বংস হলেও আমাদের আত্মকেন্দ্রিক বা বস্তুর কেন্দ্রে যা স্বকীয়, তা থেকে যায়। জিনিসটা হল আত্মা (Soul)। ওই আত্মা কি আমরা নই? অবশ্যই আমরা। কিন্তু তা বস্তুজগতের মারা নই। এই আত্মাও একধরনের বস্তু এবং তা হল পরাবস্তু। তা পরাবস্তুজগতে থাকে। আমরা তা দেখি না কারন বস্তুজগতের সাথে পরাবস্তুজগতের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্যে কোন মাধ্যম নাই।

          অনেকসময় অনেকে দাবি করে থাকেন- তিনি অমুক মৃত্যু ব্যক্তির আত্মা কে ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন। এটা সম্ভব নয়। এটা তাঁর দৃষ্টিভ্রম (Hallucination)কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হতে পারে। যদি তা প্যারালাল ইউনিভার্সের মত ঘটনা ঘটে। ওটা পরে ব্যাখ্যা করব। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে বস্তুজগতে যে আমি বেঁচে আছি, পরাবস্তুজগতেও আমার মত একজন আছে। কিন্তু তা কখনো সম্ভব নয় যদি না আমি বেচে থাকি। সেটা তখনি সম্ভব হবে যখন আমার বিনাশ হবে। এখান হতে কি বুঝা গেল- বস্তুজগতের পরপরই পরাবস্তুজগত শুরু হয়। পদার্থবিজ্ঞানে একটা সুত্র আছে-‘একটি বস্তু একই সঙ্গে দুটি স্থান দখল করতে পারেনা’। তাহলে তো এই সুত্রের সত্যতা মিলে গেল। যদি এটা মিথ্যা হতো তাহলে বস্তুজগতে যেমন আমি থাকতাম তেমনি পরাবস্তুজগতেও আমি (আমার মত হুবহু একটা কপি) থাকতাম। ওই যে আত্মার কথা বলছিলাম-সেটা হল পরাবস্তু। আচ্ছা পরাবস্তু কি আমাদের মতই ত্রিমাত্রিক? না। বস্তুর মৃত্যুর পর ওটা কি হয়? এতক্ষনের আলোচনায় যা বুঝলাম তা হল পরাবস্তু। বস্তুর মৃত্যুর পর কি তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা থাকে? তার তো সব প্রকৃতির বিনাশ হওয়ার কথা। তাহলে কি দাঁড়ায়, পরাবস্তু ত্রিমাত্রিক নয়। যদি সময় বিবেচনা করি, তাহলে দেখা যায়, বস্তুজগতে সময় হল সসীম অর্থাৎ তা হিসাব করা যায়। তাহলে পরাবস্তুজগত হবে বস্তুজগতের ঠিক উল্টো। সেখানে সময়কে হিসাব করা যায় না। মানে-সময় হল অসীম। অনন্তকাল। তাহলে সময়কেও মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করতে পারছিনা। কি দাঁড়ালো পরাবস্তুজগত হল মাত্রাশুন্য!
আমরা বাস করছি তিনমাত্রার জগতে। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা- এই মাত্রা যে জগতে বিলুপ্ত থাকে তাকে পরাবস্তুজগত বলে। আমাদের মানুষের যে ক্ষমতা তা অন্য সৃষ্টির মধ্যে নাই। আমাদের ক্ষমতা কিন্তু পরাবস্তুজগতে। কিন্তু আমরা মেতে আছি এই বস্তুজগত নিয়ে, যা কিছুক্ষনের জন্য। কিন্তু যে জগত পড়ে রয়েছে অনন্তকালের জন্য তার কথা আমরা চিন্তাও করতে পারি না।

(চলবে)

 

প্রতীক্ষা

সেদিনের সেই বিকেলবেলা
হাঁটছিলাম আমি একেলা
হঠাৎ হয়ে গেল দেখা
দুজনে হল চোখাচুখি
এসে দাঁড়ালাম মুখোমুখি
চোখের পলক আর পড়ে না।

সেই থেকে শুরু কথা বলা
আর শুরু ভালো লাগা
দুজনে মিলে ঘুরতে যাওয়া
পাশাপাশি বসে দেখে যাওয়া
তোমার ঐ হাতের স্পর্শে
শিহরিত আমি, সাহসে
বলে ফেলি- ভালোবাসি তোমায়।

তারপর আমার প্রতীক্ষার প্রহর গোনা
কবে তুমি বলবে,
তুমি আমার প্রেমে দিওয়ানা
সে আশায় বসে থেকে থেকে
একদিন তুমি আমার কাছে এসে
বল্লে-‘চল হারিয়ে যাই
তোমার প্রেমের ভেলায় ভেসে
ঐ দূর অজানায়।’

তারপর হতে রাতজাগা এই আমি
তোমার স্বপ্নে বিভোর।
সেই তুমি আমায় ছেড়ে
চলে গেলে দূরদেশে।
আজ তোমার আশায় থাকি
এই পথ চেয়ে-
বসে আছি আমি একেলা
দিগন্তের দিকে চেয়ে
ঐ দু’নয়নে।

১৩/০৮/২০১১