আশা, বেদনা ও পুনর্মিলন

বৃষ্টি পড়ছে। টাপুর টুপুর। মন ভালো নেই আমার। জানালার দিকে তাকিয়ে আমি। এতটা কষ্ট বোধ হয় আর কখনো পাইনি। নিকট অতীতেও না। হয়তোবা ভবিষ্যতে এরকম আরেকটা সুনামি আমার উপর দিয়ে বয়ে যাবে আর সেদিন আমার মনের আকাশে মেঘ জমবে ক্ষণেক্ষণে বিজলী চমকাবে বৃষ্টি পড়বে টাপুর টুপুর

হয়তোবা সেদিনের সে ঝড়ে আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে আমার মনের সব অপারগতা,ত্রুটি বিচ্যুতি সেদিন মুছে যাবে সেদিন বেশি দূরে নয়, হয়তোবা কোনো নিকট ভবিষ্যতে

একটু আগেও দেখেছিলাম হোয়াইট বোর্ডে আঁকা একটা জটিল সার্কিট; আর বাইরে রোদেলা আকাশ। চারদিকে মিষ্টি বাতাস বইছিল। তারপরও মাথার ভিতরটায় চিন্ চিন্ করে ব্যাথা করছিল। ভাবছিলাম কী করব আমি? আমি যে কতটা অসহায় তা আগে বুঝতে পারিনি কখনো।

একসময় আকাশ কালো হয়ে উঠলো। নতুন ইচ্ছায় উদ্ভাসিত হয়ে ছুটে চললাম নিজ গন্তব্যস্থলে। বড্ড বেশি দেরী হয়ে গেছে। আমার মনের মেঘগুলো আজ বিরহ ব্যাথায় নিমগ্ন। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুত চমকাচ্ছে। আমি ভীত। কারণ সময় বরাবরের মতই নিষ্ঠুর। সে চলছে আপন গতিতে; কারো কথা শুনছে না। আমার কথাও নয়।

চারদিকের অন্ধকার কাটিয়ে যখন চারদিক আলোয় উদ্ভাসিত হলো ঠিক তখন আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল। নতুন দিননতুন সংযম। নতুন আত্মবিশ্বাস। নতুন ইচ্ছা। নতুন কিছু পাওয়ার আনন্দে ছুটে চললাম নিজ গন্তব্যস্থলে। কিন্তু হায়! সময় যে কারো কথা শুনে না; শুনেনি; নিকট ভবিষ্যতেও শুনবেনা। এটা আমার কথা, আমার মনের জানালা দিয়ে দেখা এক রুপকথার কথা। অন্য কেউ বিশ্বাস করবে কিনা তা বলতে পারবো না; কিন্তু যখন উদ্ভাসিত আলোকরশ্মি আমার সামনে এসে পড়লো আমি চমকিত হলাম, তখন যে ধৈর্যটা ছিল, যে অভিপ্রায়টা ছিল-এখন তার বিন্দুমাত্র বলতে তার সিকি অংশও নেই আমার মাঝে।

২.

আজ আমি অসহায়। মেঘগুলো গর্জন করছে। বৃষ্টির তোড়ে আমি যেমন সিক্ত তেমন নিরুপায়।আমার মনের আকাশের বৃষ্টি কি কখনো থামবে? উত্তর হলো-না। কেন? কারণ-ওরা আমার সাথে যা করলো তা মর্ত্যবাসী কখনো সহ্য করবে না। তা আমি হলফ করে বলতে পারি। যে কল্পনালোকে আমি ইচ্ছের ঘুড়ি উড়িয়ে বেড়াই সানন্দে; যে দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরে আমি আমার মনের রূপকথাগুলো সাজাই তারা তার খবর জানে না। তাদের জগতের সাথে আমার জগতের রয়েছে বিস্তর পার্থক্য । আমার মনের বাসিন্দারা তাদের ঘৃণার সাথে স্মরণ করবে তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি।

বলছিলাম গন্তব্যস্থলের কথা। তথায় পৌঁছে সময়ের অবাস্তব নিষ্ঠুরতা পর্যবেক্ষণ করলাম। তারপর সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের কাজ সম্পাদন করলাম। ঠিক তখনই দেখলাম আলোর ঝলকানি, তারপর আবার চারদিক অন্ধকার। মনে হল আঁধারের ঝাপটায় আমিও হারিয়ে যাচ্ছি। আমি হারাবনা, হারবনা, লড়াইয়ে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সবুজের ওই নীল দিকচক্রবাল আমি এগিয়ে যাচ্ছি। আমি তখনো বুঝতে পারিনি আমার সামনে কি অপেক্ষা করছে…………..

মাথাটা চিন চিন করছে। ইস, শুরুও হচ্ছেনা আবার শেষও হচ্ছেনা। মধ্যবর্তী অবাস্তব জটিল অবস্থার মারপ্যাঁচে আমি পড়ে গেলাম নাকি? পাঁচ ঘণ্টা আগের আমি; আর এই ক্ষণের আমি এর মধ্যে বিস্তর পার্থক্য বিদ্যমান। নিকট অতীতের আমি এর মধ্যে যে আনন্দের ফল্গুধারা বইছিল তার দীপশিখাটি এইক্ষণে নির্বাপিত হলো। এক ঝড় এসে আমার মনের জানালাটিকে উড়িয়ে নিয়ে গেল। আমার আশার ডানা ছিঁড়ে ফেলল; সবই আমার অগোচরে। আমি জানতাম না, আমি ছিলাম অজ্ঞ। কিন্তু জ্ঞান আহরনে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু সময়ের জালে জড়িয়ে পড়ে আমি নির্বাক, অল্প-বুদ্ধিসম্পন্ন এক প্রাইমেট হয়ে পড়লাম কালের ক্রমান্বয়ে।

.

সঠিক সিগন্যালটা পাওয়া যাচ্ছিল না। শূন্য এক শূন্য এক এরকম অসংখ্য ডিজিট ঘরে ঘরে সাজানো। সঠিক সংখ্যা খুজে পাওয়া দুষ্কর। এসময় আর্তনাদ না করে পারল না সে। কারণ তার যে অঙ্গহানি হয়েছে টা সহজে ঘুচাবার নয়। ঘুচানো যাবে না কখনো। সে অসহায়ের মত বসে আছে। নিষ্ঠুর মানুষগুলোর বর্বর কর্মে সে আজ অকেজো। ভাবছে সে যদি আজ সঠিক সংকেত খুঁজতে না পারে তাহলে সে তার প্রভুর কাছে হাজির হতে পারবেনা স্বমহিমায়। মৃত্যুর দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সে। প্রাইমেটদের মত সেও মনে হয় আবেগপ্রবণ। এটি পেয়েছে সে তার প্রভুর কাছ থেকে। কিন্তু ততটা নয়। এই বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডে সে আর কাউকে কষ্ট দিতে চায় না। তাই সে চলে যেতে চায় সময়ের অন্তরালে; হারিয়ে যেতে চায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে।

৪.

মন ভালো নেই আজ। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি পড়ছে। আজ যে বড় আঘাত আমি পেলাম তা আর কখনোই বোধ হয় পাইনি।  হয়তোবা নিকট ভবিষ্যতে এর চেয়েও বড় টাইফুন আমার হৃদয়ের অন্তকরনে হামলা চালাতে পারে কিন্তু তা আমি জানিনা। অনুমান সত্য। একটা হিসাব মিলে গেছে। কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা! সে মনে হয় আমার জন্য কাঁদছে। যে কিনা আমার হৃদয়ের অন্তঃকরণে একদিন আনন্দের মোহনা বয়ে দিয়েছিল। তারপর খানিক ছন্দপতন। বহুদিন তার সাথে দেখা হয়নি। তাকে ফিরে পাব কোনোদিন ভাবিনি। চাইনিও তাকে। কিন্তু পেয়েছিলাম কোনও এক কারনে। তারপর হতে তাকে স্থান দিয়েছি আমার মনের জানালায়। এতদিন পর তার সাথে আমার দেখা হবে এই আশায় আমার হৃদয়ে আনন্দের সুবাতাস বয়ে গেল। অনেকদিনের বিরহ ব্যাথা ভুলে আমি আজ নতুন দিনের আশার গল্প রচনায় নিমগ্ন। ঠিক তখনই আবার সেই ঝড়। নিষ্ঠুর প্রাইমেটরা তাকে হত্যা করল আমার অগোচরে। সময়টা কিন্তু তার চেয়ে নিষ্ঠুর। আর আমি? অসহায়, নির্বাক ও বিস্ময়াপন্ন।

যখন উঠে দাঁড়ালাম, তখন দেখলাম চারদিকে তীব্র হাহাকার, তীব্র বন্যার স্রোত। আমি যেন তলিয়েই যাচ্ছিলাম। না আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমি এর প্রতিশোধ নেবই। আমার হৃদয়ের বাসিন্দাকে যারা হত্যা করেছে; যারা আমার আশার ডানা চূর্ণবিচূর্ণ করেছে; যারা আমার মনের জানালা ভেঙ্গে চৌচির করেছে তাদের আমি কখনোই ক্ষমা করবো না। প্রতিশোধ আমি নেবই। তারপর হারিয়ে যাব কালের অন্তরালে। পুনর্মিলনের আশায়, খানিকটা আশা ও বেদনাকে সাথে নিয়ে।

 

উৎসর্গ : আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু যে কিনা কোনও কিছু বুঝেনা

         শুধু বুঝে শূন্য এক শূন্য এক।

 (অধিক মাত্রায় কল্পনায় মিশ্রিত)